আল আমিন হাওলাদার ||
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষকদের দীর্ঘদিনের বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে নেওয়া হয়েছে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নির্দেশনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) ৯টি টিউবওয়েল বা নলকূপ স্থাপনের কাজ বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে হাওরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ‘কান্দা’ এলাকায় বাঁশের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নলকূপ স্থাপনের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।প্রতি বছর চৈত্র ও বৈশাখ মাসে যখন বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়, তখন হাজারো কৃষক দিন-রাত পরিশ্রম করে হাওর থেকে ধান কেটে উঁচু জমি বা ‘কান্দা’তে এনে জমা করেন। কিন্তু এই সময় বিস্তীর্ণ জলাভূমি এলাকায় বিশুদ্ধ পানির কোনো স্থায়ী উৎস না থাকায় তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রচণ্ড রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করার পর তৃষ্ণা মেটাতে কৃষকদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে হাওরের অপরিষ্কার ও দূষিত পানি পান করতে হতো, যা ডায়রিয়া, আমাশয়, ত্বকের রোগসহ নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিত। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না থাকায় কৃষকদের ভোগান্তি ছিল চরমে।এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কৃষকদের কষ্ট লাঘবে সময়োপযোগী এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন করে স্থাপিত টিউবওয়েলগুলো চালু হলে কৃষকরা সহজেই নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধা পাবেন। এতে শুধু তাদের তৃষ্ণা নিবারণই নয়, বরং স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং ধান কাটার পুরো মৌসুমে তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন।নির্ধারিত ৯টি টিউবওয়েলের মধ্যে সোনাডুবি কান্দায় পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি, নাগডরা কান্দায় পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি, এবং মুক্তাখলা, কাজীউরি, হাইডুলি, কাটাগোফাট কান্দা ও কলমাকান্দা বাজারে একটি করে নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে। এসব স্থান নির্বাচন করা হয়েছে কৃষকদের চলাচল ও কাজের সুবিধা বিবেচনায় রেখে, যাতে সর্বাধিক সংখ্যক কৃষক উপকৃত হতে পারেন।প্রকল্পটির কারিগরি দিক সম্পর্কে কলমাকান্দা উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলী মোসা. রুম্মান আরা জানান, হাওরের কান্দাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এবং গভীর নলকূপ বসানোর পরিবেশ না থাকায় এখানে সাবমার্সিবল পাম্পের পরিবর্তে স্বল্প গভীরতার হ্যান্ড-টিউবওয়েল বসানো হচ্ছে। যদিও স্বল্প গভীরতার কারণে পানিতে কিছুটা আয়রন থাকতে পারে, তবে তা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং তাৎক্ষণিক পানির চাহিদা পূরণে যথেষ্ট কার্যকর হবে। এছাড়া বন্যার সময় যাতে নলকূপগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রতিটি নলকূপের প্ল্যাটফর্ম উঁচু করে নির্মাণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।স্থানীয় কৃষকরা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তারা জানান, বছরের পর বছর ধরে ধান কাটার মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা চরম কষ্টে ছিলেন। অনেক সময় দূরের গ্রাম থেকে পানি এনে ব্যবহার করতে হতো, যা সময় ও শ্রম দুটোই বাড়িয়ে দিত। নতুন এই নলকূপগুলো চালু হলে তাদের সেই কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে এবং তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কৃষিকাজ করতে পারবেন।এছাড়া সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে হাওরাঞ্চলের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণযোগ্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করবে। কৃষকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে এমন কার্যকর পদক্ষেপ শুধু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতেই সহায়ক হবে না, বরং গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।সব মিলিয়ে, কলমাকান্দার হাওরাঞ্চলে এই ৯টি টিউবওয়েল স্থাপন প্রকল্প কৃষকদের জন্য এক বড় স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে—যা তাদের দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট দূর করে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।