আল আমিন হাওলাদার ||
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় স্বেচ্ছাসেবীদের মিলনমেলা ও আলোচনা সভায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, রাজনীতি কিংবা অন্য যেকোনো কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ। রাস্তাঘাট, ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণের মতো উন্নয়নমূলক কাজের চেয়েও মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা অনেক বড় দায়িত্ব ও মহৎ উদ্যোগ।সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত ‘স্বেচ্ছাসেবীদের মিলনমেলা ও আলোচনা সভা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মানবিক কাজে তরুণদের আরও বেশি সম্পৃক্ত ও উৎসাহিত করার লক্ষ্যে এ ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কলমাকান্দা যুব রক্তদান ফাউন্ডেশন।প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ, আর আমাদের সবার রক্তের রং লাল। তিনি বলেন, “আমরা কেউ গারো, কেউ হাজং, কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান। পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, বিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানবতার জায়গায় আমরা সবাই এক ও অভিন্ন।” তাঁর এই বক্তব্যে পুরো অনুষ্ঠানস্থলে মানবিক ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আনন্দ মোহন কলেজে অধ্যয়নকাল থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ও তিনি নিয়মিত রক্তদান করেছেন। পাশাপাশি রোটার্যাক্ট ক্লাবের মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে মানুষের সেবায় কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, কলমাকান্দার মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি তরুণ সংগঠন নিয়মিত রক্তদান, রক্ত সংগ্রহ এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে—এটি সত্যিই বিস্ময়কর ও প্রশংসনীয়।তিনি শুধু মৌখিক প্রশংসাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং আগামী দিনে সংগঠনটির যেকোনো মানবিক, সামাজিক ও কল্যাণমূলক উদ্যোগে ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রশাসনিকভাবেও পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিও এমন মানবিক স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে সহযোগিতার হাত আরও প্রসারিত করার আহ্বান জানান।ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আরও বলেন, কে কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাসী—তা বড় বিষয় নয়; বরং কে মানুষের কল্যাণে কাজ করছে, কে বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা। তাঁর মতে, রাজনীতির প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।অনুষ্ঠানে তিনি যুব সমাজকে প্রতি তিন থেকে ছয় মাস অন্তর রক্তদানে উৎসাহিত করেন এবং কলমাকান্দা যুব রক্তদান ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমকে শুধু রক্তদানে সীমাবদ্ধ না রেখে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, চক্ষু শিবির, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে সম্প্রসারিত করার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ (Inclusive Society) গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কলমাকান্দার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান, উপকারভোগী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফরিদ জাম্বিল, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আবুল হাসেম, কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি মুহাম্মদ এনামুল হক তালুকদার এবং উপজেলা এনসিপির সমন্বয়ক আবু কাওসার।বক্তারা কলমাকান্দা যুব রক্তদান ফাউন্ডেশনের এমন মহতী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সমাজের বিত্তবান, প্রভাবশালী ও সচেতন মানুষদের এ ধরনের মানবিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তারা বলেন, রক্তদান শুধু একটি সেবামূলক কাজ নয়, এটি মানবিক দায়িত্ববোধেরও উজ্জ্বল প্রকাশ।অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের একঝাঁক তরুণ স্বেচ্ছাসেবী লাল-সবুজ টি-শার্ট পরে অংশগ্রহণ করেন, যা আয়োজনটিতে এনে দেয় ভিন্নমাত্রার সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও প্রাণচাঞ্চল্য। এছাড়াও কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম, সাধারণ সম্পাদক মো. ওবাইদুল হক পাঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে কলমাকান্দা যুব রক্তদান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রধান অতিথি ব্যারিস্টার কায়সার কামালের হাতে সম্মাননা স্মারক (ক্রেস্ট) তুলে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবীকেও তাদের মানবিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল তরুণদের উচ্ছ্বাস, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক সমাজ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়। স্বেচ্ছাসেবীদের এই মিলনমেলা যেন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি হয়ে উঠেছিল মানবতা, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানুষের জন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য বার্তা।