কাগজে হাসপাতাল, বাস্তবে পরিত্যক্ত ভবন: কালীগঞ্জে ১৮ কোটি টাকার প্রকল্প প্রশ্নের মুখে

01 Aug 2026, 12:47 ·

দূর থেকে দেখলে মনে হবে আধুনিক একটি সরকারি হাসপাতাল। ঝকঝকে বহুতল ভবন, পরিচ্ছন্ন কক্ষ, অফিসের চেয়ার-টেবিল, এসি, এলইডি টেলিভিশন—সবই প্রস্তুত। কিন্তু কাছে গেলেই ভিন্ন চিত্র। প্রধান ফটকে তালা, করিডোরজুড়ে নীরবতা, চারপাশে আগাছা আর ঝোপঝাড়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি যেন চিকিৎসাসেবার নয়, বরং সরকারি অব্যবস্থাপনার এক নীরব স্মারক।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের তালিয়া গ্রামে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যার হাসপাতালটি নির্মাণ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি। ফলে চিকিৎসাসেবার আশায় থাকা হাজারো মানুষ প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন, আর সরকারি বিনিয়োগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে।
রাজধানীর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও পূর্বাচল নতুন শহরের লাগোয়া এলাকায় প্রায় ২.০৭৩ একর জমির ওপর হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে রয়েছে একটি মূল হাসপাতাল ভবন, তিনটি আবাসিক কোয়ার্টার, একটি জেনারেটর রুম, গ্যারেজ এবং পাম্প হাউস।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের ভেতরে প্রয়োজনীয় অনেক আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি থাকলেও নেই কোনো চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা রোগী। হাসপাতালের চারপাশ আগাছায় ঢেকে গেছে।পরিত্যক্ত পরিবেশে মশা-মাছি, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ, কুকুর ও শিয়ালের বিচরণ চোখে পড়ে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, হাসপাতালের খোলা জায়গার একটি অংশ স্থানীয়রা কৃষিখামার হিসেবে ব্যবহার করছেন। কেউ সবজি চাষ করছেন, কেউ পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে জমি কাজে লাগাচ্ছেন। স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্মিত সরকারি সম্পদ এভাবে অন্য কাজে ব্যবহৃত হলেও কার্যকর কোনো নজরদারি নেই।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রায় দুই বছরের নির্মাণকাজ শেষে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। পরে ২০২১ সালের ২০ জুন হাসপাতালটি আনুষ্ঠানিকভাবে গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর হাসপাতাল চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে ২৫টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হলেও ২০২৪ সালের মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয় ১৬টি পদ অনুমোদন দেয় এবং একই বছরের অক্টোবরে পদগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে সেই পদগুলোও হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করতে পারেনি। একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট ও দুইজন নার্স পদায়ন করা হলেও তারা বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ১২টি পদ এখনো শূন্য রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালটি চালু না হওয়ার অন্যতম বড় কারণ অর্থনৈতিক কোড (Economic Code) না থাকা। এই কোড না থাকায় হাসপাতালের নামে কোনো বাজেট বরাদ্দ হয়নি।
ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ওষুধ ক্রয়, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ কোনো খাতে অর্থ ব্যয় করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি।
প্রশ্ন উঠেছে, ভবন নির্মাণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার আগেই কেন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হয়নি? পরিকল্পনার এই সমন্বয়হীনতার দায় কার—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন-আর-রশিদ বলেন, প্রতিবারই শুনি হাসপাতাল চালু হবে। কিন্তু বছর পার হয়ে যায়, কোনো পরিবর্তন দেখি না। চালু হলে আমাদের অনেক উপকার হতো।
স্থানীয় চিকিৎসক ডা. মো. ওমর কায়ছার বলেন, সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেটি চালু না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। দ্রুত চালু করা জরুরি।
একই গ্রামের শিউলি বেগম বলেন, অসুস্থ হলে অনেক দূরে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের নিয়ে ঢাকায় যেতে খুব কষ্ট হয়। হাসপাতালটি চালু হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেক কমে যেত।"
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলেন,"এখানে দুইজন চিকিৎসক পদায়ন রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক কোড না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ওষুধ, জনবল ও বাজেট—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই হাসপাতালটি চালু করা যাবে।"
প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি হাসপাতাল পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অচল পড়ে থাকা শুধু প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার নয়, বরং জনস্বার্থে বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে। একদিকে স্থানীয় মানুষ চিকিৎসাসেবার অভাবে দূরের হাসপাতালে ছুটছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি জনবল, বাজেট, অর্থনৈতিক কোড এবং পরিচালন কাঠামো নিশ্চিত না করলে এমন প্রকল্প জনসেবার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অপচয়ের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। তালিয়া হাসপাতালের ঘটনাও সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।